নিজস্ব প্রতিবেদক।।ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় শাস্তিমূলক বদলি হয়েছিলেন। কিন্তু নতুন কর্মস্থলেও বদলায়নি তার পুরনো চরিত্র। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর-রায়পুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে এবারও উঠেছে গুরুতর সব অভিযোগ।
জমির খারিজ করতে আসা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে হাজার হাজার টাকা আদায়, সরকারি বিদ্যুৎ চুরি করে ব্যক্তিগত অটোরিকশা চার্জ দেওয়া এবং সহযোগীর মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের এক চক্র ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন তিনি।
এমনকি নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, টাকা ছাড়া এই ভূমি অফিসে কোনো কাজই হয় না। এর আগে ২০২৪ সালের শুরুতে রানীশংকৈল উপজেলায় কর্মরত থাকাকালে রেজাউল করিমের ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর জেরে তাকে শাস্তিমূলক বদলি করে ঠাকুরগাঁও সদরের জামালপুর-রায়পুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পাঠানো হয়।
কিন্তু এলাকাবাসীর ভাষ্য, এখানে এসে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
জামালপুর ইউনিয়নের ভুক্তভোগী আন্না খাওয়া নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমার ৮ শতাংশ জমির খারিজ করতে ৭ হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু খারিজ হওয়ার পর দেখি কাগজপত্রে ভুল। সেই ভুল ঠিক করে দেওয়ার জন্য তহসিলদার আমার কাছে আরো ৪ হাজার টাকা দাবি করেন।
আমি সেই টাকা দিতে বাধ্য হয়েছি।’ আরেকজন জানান, সাড়ে ১২ হাজার টাকা দেওয়ার পরও খারিজের কাগজপত্রের জন্য তাকে দিনের পর দিন ঘোরানো হয়। শেষে তহসিলদার জানিয়ে দেন, আরো ৫০০ টাকা না দিলে কাগজপত্র হাতে পাবেন না।
শুধু ঘুষ আদায়ই নয়, রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, ভূমি অফিসের ভেতরের বৈদ্যুতিক লাইন থেকে সংযোগ নিয়ে বাইরে রাখা তার ব্যক্তিগত অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, ‘একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি অফিসের বিদ্যুৎ দিয়ে নিজের গাড়ি চালাচ্ছেন, যার বিল দিচ্ছে জনগণ। এটা সরাসরি দুর্নীতি ও ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার। আমরা তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও জরিমানা আরোপের দাবি জানাই।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রেজাউল করিম তার দপ্তরে প্রচলিত আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে অকপটে কথা বলেন। তিনি জানান, মামুন নামে এক সহায়তাকারীর মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন কাজ করান এবং অর্থ লেনদেনও তার মাধ্যমেই হয়।
টাকা নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমি টাকার অঙ্ক বলি না। মানুষ যা খুশি হয়ে দিবে, না নিলে আবার মনে করবে যে আমার কাজটা হবে না… আমি টাকা না নিতে চাইলেও মানুষ জোর করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এই যে মানুষের মধ্যে একটা বদ্ধ ধারণা। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, ‘জোর করে যদি কেউ দেয়… (আমি) না করি না। এ সত্য কথা।’
অর্থ আদায়ের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘মামুনের কাজ হলো খারিজের আবেদন করে দেওয়া। তিনি বলেন, ‘আবেদন করানোর সরকারি ফি হলো ৭০ টাকা। পাবলিক যখন আবেদন করে, ১০০-১৫০ টাকা করে দেয়… হয়তো ১০০ টাকা দিল, ৩০ টাকা তার টিকল। সারাদিনে যদি চারটা-পাঁচটা আবেদন করে দেয়, তো দেড়শ টাকা তার হয়ে গেল।’
রেজাউলের তথ্যমতে, মামুন প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০টি আবেদন করে দেন। নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করে তিনি বলেন, ‘ওকে জাস্ট চিঠিপত্রগুলো করায় নেই, আমি চিঠিপত্র করতে পারি না। আমি কোনো টাকা ওর মারফতও নিই নাই।’
তিনি আরো দাবি করেন, ‘ওকে আমি বসাইনি, আগের তহসিলদারই বসাইছে।’
অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতির মাধ্যমে রেজাউল করিম বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঠাকুরগাঁও শহরের সাহাপাড়ায় পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের একটি বাড়ি নির্মাণ করছেন, যার দোতলার কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া শহর ও গ্রামে তার নামে-বেনামে আরো বহু সম্পত্তি থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, ‘অভিযোগগুলো আমরা পেয়েছি। একজন সরকারি কর্মকর্তা তার ওপর অর্পিত দায়িত্বের এমন অপব্যবহার করলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত করছে।